নয়া দিল্লি, ১১ অক্টোবর ২০২৫ — আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি তিনদিনের সরকারি সফরে ভারতে এসে দিল্লিতে একাধিক বৈঠক করেছেন। সফরে তিনি ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক নীতি নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। তবে বিশেষভাবে তার যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানবিষয়ক মন্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

🔶 যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া বার্তা: “বিদেশি নিয়ন্ত্রণ আর নয়”
দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় আমির খান মুত্তাকি বলেন,
“আফগানিস্তানের স্বাধীনতা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কোনো বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণ বা সেনা উপস্থিতি আর মেনে নেওয়া হবে না।”
তিনি উল্লেখ করেন, আফগানিস্তান তার সার্বভৌমত্বে কোনো হস্তক্ষেপ বরদাশত করবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় “বাগরাম বিমানঘাঁটি ব্যবহারের” প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য।
তালেবান সরকারের এই অবস্থান, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার প্রতি একটি সরাসরি কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।

🔶 পাকিস্তানকে হুঁশিয়ারি: “আফগানদের সাহস পরীক্ষা করবেন না”
পাকিস্তান প্রসঙ্গে মুত্তাকির মন্তব্য ছিল আরও তীব্র। তিনি বলেন,
“আফগানদের সাহসকে অবমূল্যায়ন করা ভুল হবে। আমাদের ভূমি ব্যবহার করে অন্য দেশকে আঘাত করতে কেউ পারবে না।”
মুত্তাকি স্পষ্ট জানান, আফগান ভূখণ্ড কখনোই পাকিস্তানের বা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে দেওয়া হবে না।
তার এই বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করেই দেওয়া কূটনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনার প্রেক্ষিতে।
🔶 ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে নতুন অধ্যায়
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে মুত্তাকি দীর্ঘ বৈঠক করেন। দুই দেশের প্রতিনিধিরা আফগানিস্তানে শিক্ষা, বাণিজ্য, অবকাঠামো ও মানবিক সহায়তা বিষয়ে নতুন সহযোগিতার পথ খুলে দেওয়ার বিষয়ে একমত হন।
ভারত ঘোষণা করেছে, কাবুলে তাদের “টেকনিক্যাল মিশন”কে পূর্ণাঙ্গ ভারতীয় দূতাবাসে উন্নীত করা হবে।
মুত্তাকি বলেন,
“ভারত আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাষ্ট্র। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাই।”
তিনি আশ্বাস দেন, আফগানিস্তানের মাটি কখনোই ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হবে না।

🔶 আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক বিশ্লেষণ
বিশ্ব বিশ্লেষকদের মতে, মুত্তাকির ভারত সফর তালেবান সরকারের জন্য একটি আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
যদিও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তালিকায় মুত্তাকির নাম রয়েছে, তবুও এই সফরের জন্য তাকে বিশেষ ভ্রমণ ছাড়পত্র (UN Travel Exemption) দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন —
আফগানিস্তান পাকিস্তানের বদলে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখনও উত্তেজনাপূর্ণ।
ভারতের উপস্থিতি আফগানিস্তানে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
🔶 মানবাধিকার ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া
নারীদের অধিকার ও শিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে মুত্তাকি বলেন,
“আমরা ইসলামিক আইন অনুযায়ী সকল নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করছি। বাইরের কেউ আমাদের ব্যবস্থার বিচারক নয়।”
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। আফগানিস্তানে এখনও নারীশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে কঠোর বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে।
🔶 ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
ভারত-আফগান সম্পর্কের এই নতুন অধ্যায় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য আনতে পারে।
দুই দেশই একমত যে — সন্ত্রাসবাদ দমন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বাণিজ্য হবে আগামী দিনের সহযোগিতার মূল ক্ষেত্র।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে তালেবান সরকার ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দিকে একধাপ এগিয়ে গেল।
আমির খান মুত্তাকির ভারত সফর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয় — এটি একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে।
আফগানিস্তান এখন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত হতে চায়, অন্যদিকে পাকিস্তানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারতের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি এই সম্পর্ক টেকসই হয়, তাহলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।