আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পাহাড়-পর্বত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সংস্কৃতির জন্য নেপাল সবসময়ই বিশ্ব পর্যটকদের কাছে একটি স্বপ্নের গন্তব্য। বিশেষ করে এভারেস্ট ট্রেকিং রুট, পোখরা হ্রদ কিংবা কাঠমাণ্ডুর ঐতিহ্যবাহী নগরকেন্দ্র বিদেশি ভ্রমণকারীদের টেনে আনে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের নানা ঘটনা পর্যটকদের মনে এক ধরনের ভয় সৃষ্টি করেছে। বুকিং বাতিল হচ্ছে, বিমানযাত্রা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মহল সতর্কতা জারি করছে। প্রশ্ন উঠছে— কেন নেপাল যেতে ভয় পাচ্ছেন পর্যটকরা?

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিক্ষোভের প্রভাব
সবচেয়ে বড় কারণ হলো নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা। সম্প্রতি দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়েছে, যেখানে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানী কাঠমাণ্ডু ও অন্য শহরগুলোতে সরকারি ভবন ঘিরে সমাবেশ ও সংঘর্ষের ঘটনা পর্যটন খাতকে সরাসরি আঘাত করেছে। ভ্রমণকারীরা ভয় পাচ্ছেন হঠাৎ করে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়া, বিমানবন্দর অবরোধ বা হোটেল এলাকার নিরাপত্তাহীনতার কারণে আটকে পড়তে পারেন। এই অস্থির পরিস্থিতি অনেক বিদেশি পর্যটককে সফর বাতিল করতে বাধ্য করেছে।

যাতায়াত ও বিমান সংযোগের অনিশ্চয়তা
রাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে যাতায়াত ব্যবস্থায়। বেশ কয়েকবার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে, বহু ফ্লাইট বাতিল বা সময় পরিবর্তন হয়েছে। বিদেশি পর্যটকরা যারা কয়েক দিনের ছুটিতে আসেন, তাদের জন্য এই ধরনের অনিশ্চয়তা ভ্রমণকে পুরোপুরি ভেস্তে দিতে পারে। ফলে বুকিং কমে যাচ্ছে এবং অনেকেই বিকল্প গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা
নেপাল একটি পাহাড়ি দেশ, যেখানে ভূমিধস, বন্যা ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবসময়ই বিরাজ করে। ২০২৪ সালে বর্ষার সময় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস বহু প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। সম্প্রতি আবার একটি সড়ক দুর্ঘটনায় অনেকের মৃত্যু ঘটে, যা বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও প্রচারিত হয়েছে। এসব খবর আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ট্রেকিং কিংবা সড়কপথে ভ্রমণে তারা দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন।

নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
নেপালের পর্যটন অবকাঠামো এখনও উন্নত দেশের মতো নয়। দ্রুত চিকিৎসা, জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা বা পর্যটন পুলিশের উপস্থিতি পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিক্ষোভপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিদেশি পর্যটকেরা মনে করছেন তাদের নিরাপত্তা সেভাবে নিশ্চিত নয়। অনলাইন ফোরামে অনেক পর্যটক শেয়ার করেছেন যে তারা নেপাল সফর পিছিয়ে দিচ্ছেন বা একেবারেই বাতিল করছেন।
ভিসা জটিলতা ও প্রশাসনিক সমস্যা
সম্প্রতি নেপালের ভিসা প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সামনে এসেছে। অনেক পর্যটককে সীমান্ত বা বিমানবন্দরে জটিল প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে দেশটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং নতুন ভ্রমণকারীদের কাছে “ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য” হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

সংবাদমাধ্যমের প্রভাব ও আন্তর্জাতিক সতর্কতা
দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে নেপালের বিক্ষোভ ও সহিংসতার চিত্র প্রায় প্রতিদিন প্রচারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলও নাগরিকদের ভ্রমণ বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় সফর পুনর্বিবেচনা করার পরামর্শ দিচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য ভ্রমণকারীরা নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন এবং বুকিং করতে দ্বিধা করছেন।
পর্যটন খাতে সরাসরি আঘাত
সব মিলিয়ে নেপালের পর্যটন শিল্প ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হচ্ছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পর্যটক আগমন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। চীনা পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক হারে বুকিং বাতিল হয়েছে। ট্যুর অপারেটর ও হোটেল ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি রুপির লোকসান গুনছেন। ফলে দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ অচল হয়ে পড়েছে।
নেপালের পাহাড়, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি এখনো বিশ্বের কাছে অনন্যসুন্দর। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা, যাতায়াতের অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতা মিলিয়ে পর্যটকদের মনে এক ধরনের ভয় কাজ করছে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলে নেপাল আবার পর্যটনবান্ধব গন্তব্যে পরিণত হতে পারবে। তাই ভ্রমণকারীদের উচিত সর্বশেষ খবরাখবর জানা, সাবধানতা অবলম্বন করা এবং নিশ্চিত প্রস্তুতি নিয়ে সফরে যাওয়া।